19/06/2025
#অবুঝের_পেন্সিল
#শব্দকল্পদ্রুম
#নাম- গৌরব মন্ডল
#বয়স- 18+
#বিষয়- লেখনী
#বিভাগ- বড় গল্প
#পেজ- নন পেজ
শিরোনামঃ: চিঠির ভেতর জমে থাকা নীরবতা
"কিছু ভালোবাসা শব্দ চায় না, শুধু সময়ের পরে একটা চিঠি চায়, যা বলে— ‘আমি ছিলাম, কিন্তু তুমি বোঝোনি।"
রাত্রির শেষ প্রহর।
ঘরের প্রতিটি কোণে নিঃশব্দ সুর বেজে চলেছে। বাইরের বাতাস জানালার পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে, যেন কারও অদৃশ্য উপস্থিতি হেঁটে বেড়াচ্ছে ঘরের আনাচে-কানাচে।
রুনা টেবিলের সামনে বসে আছে। চোখের নিচে গভীর কালি, ঠোঁট বিবর্ণ, মাথার চুলগুলো এলোমেলো। একটা পুরনো কাঠের বাক্স তার সামনে। এই বাক্সটা বহু বছর খোলা হয়নি। আজ হঠাৎ করেই মনে হলো—আজ খোলা দরকার।
বাক্সের ভেতর থেকে সে টেনে বের করল একটি হলুদ হয়ে যাওয়া খাম। চিঠি।
খামের উপরে ধুলো জমে আছে, লেখা প্রায় অস্পষ্ট। তবু নামটা যেন হঠাৎই আগুন ছড়িয়ে দিল তার মনের মধ্যে।
প্রেরক: আহান।
তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০১২।
রুনার গলা শুকিয়ে এল। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে উঠল।
এই চিঠিটা সে কখনও পড়েনি।
পড়তে পারেনি।
কারণ সে তখন জানত না যে এই চিঠিটিই হবে শেষ—শেষ কথা, শেষ স্বীকারোক্তি, শেষ ছোঁয়া।
আহান।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াকালীন তার সহপাঠী।
ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, আর তারপর সেই অদ্ভুত এক নীরব ভালোবাসা—যেখানে কেউ কাউকে কিছু বলেনি, তবু কেউ কখনও কারও ছায়া ছাড়েনি।
একসাথে লাইব্রেরিতে বসা, মাঝেমাঝে একসাথে রিকশায় ফেরা, শীতের সকালের নীরব হাঁটাহাঁটি।
তারা দু’জনেই জানত কিছু একটা আছে, কিন্তু নাম দেওয়া হয়নি।
ভালোবাসা? না হয়তো।
তবু এমন ভালোবাসা, যা না বলেই সমস্ত কিছু বলে দেয়।
তবে ২০১২ সালের এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই আহান নিখোঁজ হয়ে যায়।
একদিন, দুইদিন, একমাস... কেউ খুঁজে পায় না।
মেসের বন্ধুরা জানায়, সে কোথাও একটা গেছে, কিন্তু কোথায়—কেউ জানে না।
পুলিশ রিপোর্ট, খোঁজাখুঁজি, পোস্টার, সংবাদপত্র—সবই ব্যর্থ।
কয়েক বছর পর পুলিশ ফাইল বন্ধ করে দেয়।
দুর্ঘটনা? আত্মহত্যা? নিঃশব্দ প্রস্থান?
রুনা জানে না।
আজও জানে না।
সে জানে শুধু এই খামটিই একমাত্র উত্তর হতে পারে—যেটা সে এতদিন খুলে দেখেনি।
তার কারণ সে নিজেই জানে না।
তীব্র কাঁপা হাতে খামটি ছিঁড়ল সে।
একটি পাতলা কাগজ।
সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা—
---
১১ অক্টোবর, ২০১২
প্রিয় রুনা,
আজ যদি তুমি চোখে চোখ রাখো, আমি হয়তো কাঁদবো না।
আজ যদি তুমি আমার কাঁধে হাত রাখো, আমি হয়তো পিছিয়ে আসব না।
আজ যদি তুমি কিছু বলো, আমি চুপ করেই শুনে যাব।
কিন্তু তুমি তো কিছুই বলবে না, তাই আমি চিঠি লিখছি।
তুমি হয়তো বুঝোনি, আমি কতটা ভালোবেসেছি তোমায়।
অথবা হয়তো বুঝেছো, কিন্তু চুপ করে থেকেছো।
তোমার সেই নীরবতাও আমি ভালোবাসি।
তোমার চোখের নিচে জমে থাকা ক্লান্তি,
তোমার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা গালভাঙা হাসি—
আমি প্রতিটি নিঃশ্বাসে বেঁচে থেকেছি তোমার ছায়ায়।
অনেকবার বলতে চেয়েছি—
"তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।"
কিন্তু সময় আর সাহস—দুটোই আমার ছিল না।
তবু চিঠির শব্দগুলো দিয়ে আজ জানিয়ে দিচ্ছি—
তুমি ছিলে, আছো, থাকবে।
রুনা, আমি চলে যাচ্ছি।
কোথায় যাচ্ছি এখন বলব না।
কারণ জানলে তুমি থামাতে চাইবে।
তোমার চোখে জল আমি দেখতে পারব না।
তুমি জানো ,আমি ক্যান্সারে ভুগছি?
Stage IV.
ডাক্তার বলেছে হাতে মাত্র কয়েক মাস।
তুমি জানো না, কারণ আমি চাইনি তুমি জানো।
তুমি যখন আমার পাশে বসে হাসো, আমার ব্যথাগুলো গলে যায় কিছুক্ষণের জন্য।
আমি চাইনি তোমার চোখে কান্না দেখি।
তুমি একা মেয়ে, নিজের যুদ্ধেই ক্লান্ত।
আমি চাইনি তোমার কাঁধে আরেকটি বোঝা হয়ে যাই।
এই চিঠিটা আমি ডাকঘরে ফেলব না।
আমি চাই না তুমি সময়মতো পড়ো।
তুমি পড়বে, যখন সময় ঠিক হবে।
তোমার জীবনে নিশ্চয়ই নতুন কিছু আসবে।
আমি প্রার্থনা করব যেন সুখে থাকো।
তবে যদি কোনোদিন, কোনো এক রাতে, তুমি আমার কথা ভাবো,
তবে জেনে নিও—আমি সেদিনও ভালোবেসে যাচ্ছি।
আর একটা অনুরোধ—
যদি কোনোদিন তুমি কাউকে ভালোবাসো, তাকে বলো।
নীরবতা বড় নিষ্ঠুর।
ভালো থেকো, রুনা।
তোমার মধ্যেই আমি বেঁচে থাকতে চাই।
ভালোবাসায়,
আহান।
..
---
চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে।
চিঠিটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ বসে আছে রুনা।
বারোটা বছর কেটে গেছে।
বারোটা শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা পেরিয়ে গেছে—
কিন্তু এই চিঠির শব্দগুলো যেন সময় ছাড়িয়ে এসে আঘাত করে বুকের গভীরে।
তার চোখের কোণে জল।
তবু সে কাঁদছে না।
সে শুধু তাকিয়ে আছে জানালার বাইরের অন্ধকারে,
যেখানে হয়তো আহান এখনও কোনো রাত্রির ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
তার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই শেষ দিনের কথা—
সেদিন বিকেলে আহান কিছু বলতে চেয়েছিল।
সে ব্যস্ত ছিল।
বলেছিল, “আজ না আহান, ক্লাসের পরে বসো একটু।”
ক্লাস শেষে আহান আসেনি।
আর কোনোদিন আসেনি।
রুনা জানত না, সেদিনই ছিল "শেষ দিন।"
আজ এই চিঠির শব্দে সে যেন ফিরে গেল সেই বিকেলবেলায়।
আহানের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছে সে—একটা অপ্রকাশ্য কান্না, একটা অসমাপ্ত কথা।
বারো বছর ধরে জমে থাকা এই নীরবতা আজ শব্দ পেয়েছে।
আহানের হাতে লেখা, মৃত্যুর আগের শেষ স্বীকারোক্তি হয়ে।
রুনা চিঠিটা বুকে চেপে ধরে।
তার কাঁধে ভেঙে পড়ছে অনুতাপের ভার।
একটা চিঠির ওজন যে এতটা হতে পারে, সে জানত না।
তার মনে হয়, এ কেবল একটি চিঠি নয়—
"এ এক জীবন, যা বলা হয়নি, বোঝানো হয়নি, কিন্তু চিরকাল ছিল।"
রাত্রির নিস্তব্ধতা আর চিঠির শব্দ মিলেমিশে
একটি অদ্ভুত সুর বাজাতে থাকে তার মনে।
সেই সুর কেউ শুনতে পায় না, কেবল রুনা শুনতে পায়।
একটা ভালোবাসা—
যা কোনোদিন উচ্চারিত হয়নি,
তবু চিরকাল বেঁচে থাকবে চিঠির ভেতর জমে থাকা নীরবতায়।
"ভালোবাসা চুপ করে থাকলে, তা মৃত্যু হয়ে যায়"—তুই ঠিক বলেছিলি আহান... কিন্তু এই মৃত্যু তো আমাকেও বাঁচতে দিল না।"