28/05/2026
এক জোড়া চশমা আর এক কাপ চা।
অজয় মজুমদার।
পৌষের শেষ, বাইরে তখনো কুয়াশার চাদরটা ভালোভাবে গোটায়নি। শিউলি গাছের তলায় ভেজা ঘাসের ওপর দুটো টুনটুনি পাখি তিড়িং-বিড়িং করে নাচছে।
বিছানা ছেড়ে নামতেই চারুরানি দেবীর হাঁটু দুটো চড়চড় করে উঠল। বয়েস তো আর কম হলো না, পঁচাত্তরের কোঠায় পা দিয়েছেন। কিন্তু ওই যে স্বভাব! ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই তার চোখ খুলে যায়। গায়ে একটা পুরনো খয়েরি রঙের শাল জড়িয়ে তিনি রান্নাঘরে এলেন। উদ্দেশ্য একটাই— উনুন ধরিয়ে জল গরম করা। অবিনাশবাবুর আবার সকাল সকাল এক কাপ আদা-মরিচ দেওয়া গরম চা না হলে চলে না।
ওদিকে ঘরের ভেতর, খাটের ওপর বসে অবিনাশবাবু তখনো নিজের চশমাটা হাতড়াচ্ছেন। চশমা জোড়া নাকের ডগায় আসতেই কাশির একটা হালকা দমক সামলে নিয়ে তিনি বাইরের দিকে তাকালেন। রান্নাঘর থেকে খড়কুটো আর কাঠের আগুনের হালকা ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
অবিনাশবাবু মনে মনে চটে উঠলেন, "এই একরোখা বুড়িটাকে নিয়ে আর পারা গেল না! ডাক্তারবাবু পরিষ্কার বলেছেন এই ঠান্ডায় ভোরে উঠে ধোঁয়ার মধ্যে না যেতে, কিন্তু শুনবে কে!"
লাঠিটায় ভর দিয়ে, চটি জোড়া পায়ে গলিয়ে অবিনাশবাবু গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরের দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন। দেখলেন, চারুরানি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে ফুঁ দিয়ে উনুন ধরাবার চেষ্টা করছেন, আর ধোঁয়ায় তাঁর চোখ দুটো লাল হয়ে জল বেরোচ্ছে।
অবিনাশবাবু দরজার চৌকাঠে লাঠি দিয়ে একটা ঠকঠক আওয়াজ করলেন। কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে, গলাটা খাঁকরে বললেন, "কী হচ্ছেটা কী শুনি? এই কুয়াশার মধ্যে চাদরটা ভালো করে না জড়িয়েই রান্নাঘরে ঢুকে পড়া হয়েছে? রোগটা তো বাঁধাবে নিজের, আর ভুগতে হবে আমায়!"
চারুরানি উনুন থেকে মুখটা ফিরিয়ে আঁচল দিয়ে চোখের জলটা মুছলেন। তারপর ফোঁকলা মুখে একটুখানি ঝাজালো সুরে বললেন, "আহা রে! আমার জন্য ওনার কত চিন্তা! নিজে যে কাল রাত থেকে খুসখুস করে কাশছ, মাফলারটা গলায় না জড়িয়েই বাইরে চলে এলে, তার কী? ঠাণ্ডা লেগে যদি জ্বরটা আবার বাড়ে, তখন এই বুড়ো বয়সে সাধ্যি কার যে তোমার সেবা করে!"
"আমি তো চাদর জড়িয়েই এসেছি, আর এই দেখো মাফলারটাও এনেছি," অবিনাশবাবু হাতের মাফলারটা দেখিয়ে একটু আমতা আমতা করলেন। আসলে তাড়াতাড়িতে ওটা গলায় জড়াতে ভুলেই গিয়েছিলেন।
চারুরানি উনুন থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো একপাশে সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। অবিনাশবাবুর হাতের থেকে মাফলারটা কেড়ে নিয়ে নিজেই পরম যত্নে বুড়ো বরের গলায় ভালো করে জড়িয়ে দিলেন। মুখটা গম্ভীর রাখার চেষ্টা করলেও, ঠোঁটের কোণের আলগা হাসিটা লুকোতে পারলেন না।
বললেন, "হয়েছে, আর বাহাদুরির জ্যাঠামো করতে হবে না। চলো, দাওয়ায় বোসো। চা হয়ে এসেছে।"
দাওয়ার কোণে পেতে রাখা দুটো কাঠের পিঁড়িতে দুজনে পাশাপাশি বসলেন। চারুরানি ধোঁয়া ওঠা দুটো মাটির ভাঁড়ে আদা-চা এনে অবিনাশবাবুর হাতে দিলেন।
কুয়াশাভেজা সেই ভোরে, চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে অবিনাশবাবু চারুরানির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চশমার ওপর দিয়ে মিটিমিটি হাসলেন। চারুরানিও তাঁর সেই চিরপরিচিত ফোঁকলা দাঁতের হাসি ছড়িয়ে দিলেন।
বাইরে তখনো পৌষের কনকনে হাওয়া, কিন্তু সেই জীর্ণ দাওয়ায় দুটো বুড়ো-বুড়ির বসন্তের মতো ওমে ভরা হাসির শব্দে চারপাশটা যেন এক লহমায় মায়াময় আর প্রেমময় হয়ে উঠল। জীবনের পঞ্চাশটা বছর পেরিয়ে এসেও, ভালোবাসার এই ওমটুকু একটুও কমেনি, বরং চুলে ধরা পাকের মতোই তা আরও গাঢ় হয়েছে।