30/06/2023
বাবা আজ ছয় দিন হলো হাসপাতালে। আমার মায়ের বাড়ির আত্মীয়, বাবার বাড়ির আত্মীয় সবাই এসে বাবাকে দেখে গেছে। আমার সকল আত্নীয়দের মধ্যে একটাই প্রশ্ন,, আমার মা কোথায় গেলো?? আমি তাদের কোনো কথার জবাব দিতে পারলাম না। যদি বলি আমার মা মারা গেছে তাহলে মায়ের লাশ দেখাবো কি করে?? সত্যি কথা বললেও হয়তো বিশ্বাস করবে না। উল্টো পাগল ভাববে!! তাই বুকে পাথর চেপে কান্নাভরা মন নিয়ে বলে দিয়েছি আমার মা হারিয়ে গেছে। কিন্তু তারা কেওই আমার কথা বিশ্বাস করছে না। এই কয়দিন কান্নার ঝড় বয়ে গেছে আমার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে। আমার বাবা কারো সাথে তেমন কথা বলে নি। মায়ের মৃত্যুর কথা শুনার পর গভীরভাবে আঘাত পেয়েছেন তিনি। ডাক্তার বলেছেন মানসিক ভাবে উনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই সুস্থ হতে বেশ সময় লাগবে। তাই আমি বাবাকে হাসপাতালে রেখে বাবাকে সুস্থ করার সর্বোত্তম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি....
বাবার বেডের সামনে একটা টুলে বসে আছি। আমার দাদা দাদী পাশের বেডে বসে আছেন। তারা দুজন অনেক কথাই বলছেন কিন্তু আমি অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছি। কোনো কথাই শুনছি না। ভাবছি,, ওই খুনি বাচ্চাটার কাহিনী এখানেই শেষ তো!! ও আবার ফিরে আসবে নাতো!! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত আটটা বেজে গেছে। বাবার জন্য কিছু খাবার আনতে হবে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে দাদীকে বললাম,,
দাদী আমি ক্যান্টিনে যাচ্ছি। তোমাদের জন্য কিছু আনবো??
তখন দাদা বললো,, না কিছু লাগবে না। তোর কাকা খাবার পাঠাবে। আমাদের জন্য, তোর জন্য আর তোর বাবার জন্য। এখন আপাতত তোর দাদীর জন্য কিছু হালকা খাবার নিয়ে আয়।
আমি রুমের দরজা দিয়ে বের হলাম। হঠাৎ দেখলাম আবির আংকেল একটা ছোট মেয়েকে নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। উনি আমার বাবার ছোট বেলার বন্ধু। অনেকদিন আগে দেখেছি ওনাকে!! আগে তো রেগুলার আমাদের বাসায় আসতো!! আমাকে দেখেই বলতে লাগলেন,,
তোমার বাবা কোথায়?? তোমার বাবা শুনলাম অসুস্থ!! তাই তোমার বাবাকে দেখতে এসেছি। কাজের চাপে এতদিন আসা হয়নি...
আমি বললাম,, উনি বেডে শুয়ে আছে। আপনি ভিতরে আসুন...
আমি ওনাকে ভিতরে নিয়ে এলে হঠাৎ বন্ধু আবিরকে অনেকদিন পর দেখে আমার বাবা উঠে বসলেন। আমি আংকেলের হাতে করে আনা ফ্রুট ব্যাগ নিয়ে এক সাইডে লাগলাম। দেখলাম আংকেল আসাতে বাবা বেশ খুশি হয়ে গেছেন। বাবা আমাকে বসতে বললে আমি তাদের সামনে একটা টুলে বসে পড়লাম। তারপর আংকেল বাবাকে বলতে লাগলো,,
ভাবি কোথায়?? উনাকে কোথাও দেখছি না...
আংকেলের কথা শুনে তখন বাবা চুপ হয়ে গেলেন। বাবা আর কোনো কথা বললেন না। ভেবেছিলাম বাবা হয়তো আংকেল আসাতে একটু খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু মায়ের কথা মনে করাতেই উনি আবার কষ্ট পেয়েছেন। আমার দাদী বলতে লাগলেন,,
ওরা বলছে বউমা হারিয়ে গেছে। আর তো কিছুই বলছে না। কোথায় চলে গেছে মেয়েটা। যেখানে যায় যেনো ভালা থাকে...
তারপর আমি আংকেলকে বলতে লাগলাম,, আন্টিকে সঙ্গে করে আনেন নি??
আংকেল বললো,, না,, আসবে বলেছিলো। কিন্তু আমি আনি নি। বলেছি কালকে সকালে আসতে। আসবে সমস্যা নেই। আমার সাথে আমার মেয়ে ইলমা এসেছে..
তারপর আমি আংকেলের মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভয়ে চমকে উঠলাম। ওর ফেস কিছুটা ওই খুনি বাচ্চার মায়ের সাথে মিলছে!! এটা কি করে সম্ভব!! আমি আংকেলকে নিচু গলায় বলতে লাগলাম,,
ও আপনার মেয়ে ইলমা!! সেই ছোট থাকতে একবার দেখেছি। এখন তো চেহারার বেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে। কত বছর চলছে ওর..
আংকেল বললো,, এইতো সামনের আগষ্ট মাসের চার তারিখে পাঁচ বছর পড়বে। বেশিরভাগ সময় ওর মায়ের সাথেই থাকে। ওর মা কয়েকদিন পরপর বাবার বাড়ি গেলে ওকে নিয়ে যায়। ভীষণ জেদি মেয়ে একটা। যেটা বায়না করবে সেটা নিয়েই ছাড়বে...
তারপর ওই বাচ্চা মেয়েটা চিকন গলায় মিষ্টি সুরে ওর বাবাকে বলতে লাগলো,, বাবা তুমি এই কথা বললে কেনো?? এখন আমাকে চকলেট কিনে দাও...
আংকেল বললো,, তোমার বাসায় তো অনেক চকলেট বক্স আছে মামনি। বাসায় গিয়ে নিও...
মেয়েটা বললো,, তাহলে এখনি আমাকে বাসায় নিয়ে চলো..আমার এখানে ভালো লাগছে না। আমি আমার আম্মুর কাছে যাবো...
তারপর আংকেল বললেন,, আচ্ছা মোস্তাফিজ!! তুমি তো আমার বাসা চিনো। এখান থেকে বেশি দূরে নয়। আর না চিনলে আমার মেয়ে চিনিয়ে দিবে। ও রাস্তা চিনে গেছে। আর ওকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে এসো। বায়না ধরেছে আর থামবে না। আর আসার সময় আমার ঔষধ বক্সটা নিয়ে এসো। আজকে রাতে এখানেই থাকবো। তোমার বাবার অবস্থা খুব খারাপ। তাই যেতে ইচ্ছে করছে না।
আমি বললাম,, আচ্ছা আংকেল,, আমি ওকে ওর মায়ের কাছেই দিয়ে আসছি...
তারপর আংকেল ওনার মেয়েকে বললো,, তোমার ভাইয়ার সাথে বাসায় চলে যাও মামনি।। আর কাল সকালে তোমার আম্মুর সাথে চলে আসবে। আর রাস্তায় তোমার ভাইয়াকে কোনো ডিস্টার্ব করবে না কিন্তু...
মেয়েটা বললো,, আচ্ছা বাবা ঠিক আছে...
তারপর আমি ওকে কোলে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে এলাম। তারপর সিড়ি দিয়ে নেমে হাসপাতালের গেইট দিয়ে বাইরে চলে এলাম। তারপর মেয়েটা আমাকে বলতে লাগলো,,
তাড়াতাড়ি নিয়ে চলেন আমাকে বাসায়। আমি আমার আম্মুর কাছে যাবো...
আমি বললাম,, এইতো যাচ্ছি। আগে গাড়িতে উঠে নেই।
তারপর একটা রিক্সা নিলাম। মেয়েটাকে আমি কোলে নিয়ে ভাবতে লাগলাম,, মেয়েটার চেহারা আমার ওই খুনি বাচ্চার মায়ের মত লাগছে কেনো!! না না,, এটা হতে পারে না!! এই বাচ্চা মেয়েটা এতটা নিষ্পাপ!!তার ওপর ও আমার আংকেলের মেয়ে। হয়তো আমার ভুল হচ্ছে। মনে হয় ওই খুনি বাচ্চার মায়ের কথা বেশি ভাবার কারণে এরকমটা হচ্ছে। আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও একমনে রাস্তায় ছুটে চলা গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে...
প্রায় আধ ঘন্টা পর আমি আংকেলের বাড়ি পৌছালাম। রিক্সাওয়ালা বাড়ির গেইটের সামনে থামলে আমি ভাড়া দিয়ে বাড়ির সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম। মেয়েটি বললো,, তিন তলায় চলেন ভাইয়া।। আমি তিন তলায় উঠে কলিং বেল চাপতেই আন্টি দরজা খুললেন। দরজা খুলতেই মেয়েটা তার মায়ের কোলে ঝাপিয়ে পড়লো। আন্টি মেয়েটাকে কোলে নিয়ে আমাকে বলতে লাগলো..
কেমন আছো তুমি? হঠাৎ আজকে আমার বাড়িতে আসতে মন চাইলো!!
আমি বললাম, এইতো আন্টি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন??
আন্টি বললো,, ভালো আছি। তোমার বাবা কেমন আছে??
আমি বললাম,, এখন মোটামুটি সুস্থ। আংকেল ওনার সাথে আছে। কাল সকালে আসবেন দেখা করতে। আর এই আপনার মেয়েকে দিয়ে গেলাম। খুব মিষ্টি দেখতে ও...
আন্টি মুচকি হেসে বললো,,হুম,, খুব জেদিও। আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো?? ভিতরে এসে বসো...
আমি বললাম, না আন্টি। অন্য একদিন সময় করে আসবো। আমাকে এখন বাবার কাছে যেতে হবে। কালকে সকালে আসবেন কিন্তু...
তারপর আন্টি দরজা লাগিয়ে দিলে আমি সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসি। আমি গেইটের বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ মনে হলো আংকেল তো আমাকে ঔষধ বক্স আনতে বলেছিলো। না নিয়ে গেলে হয়তো উনি রাগ করবেন। তাই আমি আবার ঔষধ বক্স আনতে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। আমি তিন তলার দরজার সামনে এসে ভয়ে চমকে উঠলাম। দেখলাম দরজাটা খোলা!! আমি ভিতরে গিয়ে দেখি মেঝেতে অনেক রক্ত পড়ে আছে। আমি হাত দিয়ে দেখলাম এটাতো তাজা রক্ত!! আর এগুলো কিসের রক্ত!! আমি দেখলাম ওই বাচ্চা মেয়েটা খাটের ওপর বসে আছে। একটা খেলনা গাড়ি দিয়ে খেলা করছে ও। আর আন্টিকে কোথাও দেখতে পারছিলাম না। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। আমি ঘরের আশেপাশে ভয়ে ভয়ে তাকাতে লাগলাম। হাতে রক্ত লাগায় বেসিনের সামনে গিয়ে হাত ধুতে লাগলাম। হঠাৎ আমি বেসিনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। দেখলাম বেসিনে একটা কাটা আঙ্গুল পড়ে আছে। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আন্টিকে ডাকতে লাগলাম। ওই বাচ্চা মেয়েটা চুপচাপ গাড়ি নিয়ে খেলা করছিলো। আর কোনোদিকে মনোযোগ নেই। আমি রান্নাঘরের দিকে গিয়ে দেখলাম দুইটা কাটা চোখ আর কিছু মানুষের চামড়ার মত দেখতে পলিথিনে ভরা অবস্থায় চুলোর মধ্যে পড়ে আছে। পাশে একটা বটি দেখতে পেলাম সেখানে প্রচুর রক্ত লাগানো ছিলো। এগুলো দেখে ভয়ে ক্রমশ ঘামছিলাম আমি। আমার হার্টবিট ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ আমার আন্টির ঘরের ফ্রিজের দিকে নজর গেলো। দেখলাম ডিপের ফ্রিজটা সামান্য খোলা অবস্থায় আছে আর তা থেকে প্রচুর পরিমাণে রক্ত পড়ছে। আমি ধীরে ধীরে ফ্রিজটার দিকে এগোলাম। ফ্রিজটার খুলতেই ভয়ে আমার আত্মা কেঁপে উঠলাম। দেখলাম হাত পা আর শরীরের বাকি অংশ টুকরো করা অবস্থায় ফ্রিজের ডিপ ভরে গেছে। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে কাটা হাত গুলো সরিয়ে হঠাৎ কাটা মুন্ডুটা দেখে চিৎকার দিয়ে ঘরের মেঝেতে বসে পড়লাম। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। এটাতো আন্টির কাটা মাথা!! তারমানে আন্টিকে কেও এভাবে নৃশংস ভাবে মেরে দিয়েছে। কিন্তু এতো কম সময়ে ওনাকে এভাবে মারলো কে?? আমি খাটে বসে থাকা ওই বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকালাম। ও চুপচাপ গাড়ি নিয়ে খেলা করছে। হঠাৎ ও আমার দিকে তাকালো। আমি খেয়াল করলাম ওর চোখে মুখে দুরন্তর হাসির চিহ্ন.....
---It will Continue...?
আত্মার_খোঁজে_সিজন_2
পর্ব_১
(সকল পর্ব ঠিক রাত আটটায় দিবো...)