17/11/2025
আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন শুরু হয়েছিল এক অসম্ভব দারিদ্র্যের বাস্তবতায়। ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগরা গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি জমিদার ও মহাজনদের শোষণ প্রত্যক্ষ করেছেন। টাঙ্গাইলের কাগমারীতে শিক্ষকতা করতে গিয়ে তিনি দেখেন, সাধারণ কৃষকরা ঋণের বোঝায় নিঃস্ব হচ্ছে। ভাসানী এটিকে কেবল অর্থনৈতিক শোষণ হিসেবে দেখেননি; তিনি বুঝেছিলেন এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিকল্পিত দমননীতির অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করে।
১৯০৪ সালে আসামে গিয়ে তিনি দেখলেন বাঙালি কৃষকদের ওপর “লাইন সিস্টেম” এর বৈষম্যমূলক নিষেধাজ্ঞা- সীমিত এলাকায় বসবাস বাধ্যতামূলক, অধিকারের চরম সংকোচন। সেখানে তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের সংগঠিত করে অধিকার রক্ষার লড়াই শুরু করেন। ১৯২৪ সালে ব্রহ্মপুত্রের একটি চরে হাজারো কৃষককে নিয়ে তিনি কৃষক সমাবেশ করেন। যা পরে “ভাসান চর” নামে পরিচিতি পায়। সেখান থেকেই তাঁর নাম হয় ‘ভাসানী’। তাঁর ডাকে ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জের কাওরাখোলায় প্রায় দুই লাখ কৃষকের অংশগ্রহণে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন, যা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম কৃষক সমাবেশ। আসামে তিনি “আসাম চাষি মজুর সমিতি” গঠন করে স্থানীয় শাসক ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান। এভাবেই তিনি ভারতের কৃষক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন হয়ে উঠেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলায় ফিরে তিনি দেখলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের একচ্ছত্র আধিপত্যে পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ। এখান থেকেই শুরু হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর নতুন লড়াই।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ভাসানীর জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আইয়ুব খানের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি ‘ঘেরাও আন্দোলন’, ‘গ্রাম-হাট হরতাল’ এমন নতুন কৌশল প্রণয়ন করে আন্দোলনকে শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দেন। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষ তাঁর নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়।
১৯৭৬ সালে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে ৯৬ বছর বয়সে তিনি রাজশাহী থেকে ঐতিহাসিক লংমার্চ শুরু করেন। সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসমাজ তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। এই লংমার্চ শুধু প্রতিবাদ ছিল না; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ঘোষিত প্রতীক হয়ে ওঠে। তিনি বলেছিলেন-
“আমরা পিন্ডির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছি; দিল্লির শৃঙ্খলে বাঁধা হতে পারি না।”
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের নেতৃত্বে যে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়-তা মূলত ভাসানীর সংগ্রামী ঐতিহ্যের স্বতঃস্ফূর্ত ধারাবাহিকতা। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অব্যাহত প্রভাব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক একচেটিয়ার বিরুদ্ধে ছাত্র-নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে ভাসানীর লড়াই প্রেরণা যুগিয়েছে।
মজলুম জননেতা মুহাম্মদ আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৭ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর সাহস, তাঁর সংগ্রাম আজও প্রবহমান। ভাসানী দেখিয়েছেন শোষণ, বৈষম্য বা সাম্রাজ্যবাদ কখনোই স্থায়ী হয় না।
শিশু আব্দুল হামিদ খান থেকে মজলুম জননেতা হয়ে ওঠার তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে বাংলাদেশের ফাউন্ডিং ফাদার্সের একজনে পরিণত করে।
উল্লেখ্য, ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কুড়িগ্রামের চিলমারী ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের হরিপুরকে সংযোগকারী তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত ১,৪৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের তৃতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর নাম তাঁর লড়াই–সংগ্রামের স্মৃতিস্বরূপ ‘মওলানা ভাসানী সেতু’ রাখা হয়।
-এডমিন